Showing posts with label রচনা. Show all posts
Showing posts with label রচনা. Show all posts

Wednesday, 18 May 2016

বিশ্বায়ন

(সংকেত: ভূমিকা; বিশ্বায়নের সংজ্ঞা; বিশ্বায়নের উৎপত্তি; বিশ্বায়নের উদ্দেশ্য; বিশ্বায়নের বৈশিষ্ট্য; বিশ্বায়নের কারণ; বিশ্বায়নের সুফল; বিশ্বায়নের কুফল; আমাদের করণীয়; উপসংহার।)
ভূমিকাঃ বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত একটি বিষয় হচ্ছে বিশ্বায়ন। যার মাধ্যমে বিশ্ববাসী তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে নিজেদের নাগালের মধ্যে নিয়ে এসেছে। যার ফলে জাতি-রাষ্ট্রের ধারণাটি উঠে গিয়ে সমগ্র বিশ্ব একটি গ্রামে পরিণত হয়েছে। এ সম্পর্কে পল হারস্ট ও গ্রাহাম থমসন বলেন, 'Globalization has become a fashionable concept in the social sciences.'
বিশ্বায়নের সংজ্ঞাঃ ‘বিশ্বায়নের’ ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Globalization যা Globe শব্দ থেকে এসেছে। সাধারণভাবে বলা যায় বিশ্বায়ন হলো একটি প্রক্রিয়া, যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিশ্ববাসীর মাঝে সমন্বয় সাধন হয়ে থাকে অথবা বিশ্বকে একীভূত করা হয়। বিশ্বায়নের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে Red wood বলেন, “Globalization is the creation of single world market”. আবার মার্টিন আলব্রো বলেন- ‘বিশ্বায়ন হলো সামগ্রিক কমিউনিটির মধ্যে সমস্ত মানুষকে নিয়ে আসার একটি প্রক্রিয়া।’ সুতরাং বলা যায় বিশ্বায়ন হচ্ছে সীমারেখাহীন বিশ্বব্যবস্থা, যার দ্বারা বিশ্বে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক তৈরি হয়ে থাকে।
বিশ্বায়নের উৎপত্তিঃ ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর বিশ্বায়ন শব্দটির প্রচলন ঘটে। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, গত শতাব্দীর ৬০-এর দশকের শেষ দিকে ‘ক্লাব অব রোম’ অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপর পাশ্চাত্য মডেলের সীমাহীন প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে যে ঘোষণা দেয় সেখান থেকেই মূলত বিশ্বায়নের সূত্রপাত হয়। যার মাধ্যমে আজ বিশ্বে সৃষ্টি হয়েছে একই বিশ্বসীমানা ও একই বিশ্ব সম্প্রদায়।
বিশ্বায়নের উদ্দেশ্যঃ বিশ্বায়ন ধারণার মূল উদ্দেশ্য হলো বাজার সম্পর্কিত আইন প্রণয়ন করা, সরকারি ব্যয় ও নিয়ন্ত্রণ হ্রাস এবং সরকারি সম্পত্তি ধারণার বিলোপ সাধন করে তা বেসরকারি আওতায় নিয়ে আসা। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বায়নের লক্ষ্য হলো স্নায়ুযুদ্ধের অবসান, পূর্ব-ইউরোপ ও পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্র ও নিয়ন্ত্রিত অর্থ ব্যবস্থার উপর গণতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতির আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।
বিশ্বায়নের বৈশিষ্ট্যঃ বর্তমান বিশ্বে বিশ্বায়ন প্রচন্ড গতিতে এগিয়ে চলছে। এর কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন-
- বিশ্বায়ন একটি জটিল ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া।
- প্রযুক্তির দ্বারা বিশ্বায়ন নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে।
- বিশ্বায়ন একটি পরিবর্তনশীল বিষয়।
- বিশ্বায়ন নতুন কৌশলে নব্য উপনিবেশবাদের জন্ম দিয়েছে।
- বিশ্বায়ন সমস্ত বিশ্বের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে বিশ্বকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে।
- বিশ্বায়ন সাম্রাজ্যবাদের ধারক ও বাহক হিসেবে কাজ করে।
- বিশ্বায়ন উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।
- একে অপরকে সহযোগিতার জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন গড়ে তুলেছে অর্থাৎ FU, AU, ASEAN বিশ্বায়নের সৃষ্টি।
- বিশ্বায়নের চলার যে গতি তাতে সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায় না।
বিশ্বায়নের কারণঃ বিশ্বায়নের জন্য কোনো একক কারণ দায়ী নয় বরং এর পেছনে রয়েছে এক বা একাধিক কারণ। সেগুলো হলো -
তথ্য ও প্রযুক্তির বিকাশঃ বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার প্রধানতম কারণ হচ্ছে তথ্য ও প্রযুক্তির অবাধ বিকাশ। আর এ বিকাশের ধারাবাহিকতায় ঔপনিবেশিক আমল হতে প্রথম টেলিগ্রাফ লাইন স্থাপন করা হয়। এরপর রেডিও টেলিভিশন, কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট প্রভৃতির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী যোগাযোগের একটা সেতুবন্ধন তৈরি করা হয়।
সমাজতন্ত্রের পতনঃ নব্বই-এর দশকে সমাজতন্ত্রের পতন সংঘটিত হলে তার জায়গাটি দখল করে মূলত সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। আর এই শক্তির দ্বারাই পরবর্তীতে বিশ্বায়নের পথ প্রশস্ত হয়।
গণতন্ত্রের প্রসারঃ একটা সময় রাজতন্ত্রের জোয়ারের ফলে বিশ্বায়নের ধারণাটিই স্পষ্ট ছিল না। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে গণতন্ত্রের অবাধ প্রসারের ফলে বিশ্বায়নের গতিও কিছুটা বৃদ্ধি পায়।
পরিবর্তনশীল সমাজব্যবস্থাঃ পৃথিবীতে স্থায়ী বলতে কিছু নেই। এই সাধারণ নিয়মের সাথে একাত্বতা ঘোষণা করে বিশ্বের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। ঠিক একই সাথে বিশ্বায়নের বিকাশও ত্বরান্বিত হচ্ছে।
বহুজাতিক সংস্থাঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিশ্বে বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থা জন্ম নিয়েছে। যা বিভিন্ন দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে একটা যোগসূত্র স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। আর এ সমস্ত বহুজাতিক সংস্থার মাধ্যমে বিশ্বায়নের পথ সহজ হয়েছে।
তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়ন স্পৃহা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবস্থা খারাপ অবস্থায় পতিত হয়। তাই উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের চলমান উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য বিশ্বায়নকে স্বাগত জানায়।
বিশ্বায়নের সুফলঃ বিশ্বায়ন একটি আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার বেশ কিছু সুফল রয়েছে যা নিম্মরূপ-
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উন্নয়নঃ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশ্বায়নের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। বিশ্বায়নের ফলে ইউরোপের দেশসমূহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠন করেছে। এছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সহযোগিতামূলক জোট গড়ার মাধ্যমে বিশ্বে সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে।
মুক্তবাজার অর্থনীতির বিকাশঃ বিশ্বায়নের ধারণার সাথে মুক্তবাজার অর্থনীতির সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। মুক্তবাজার অর্থনীতির ফলস্বরূপ বিশ্ববাজার ব্যবস্থার দ্বার সকলের কাছে উম্মোচিত হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য এখন মানুষের হাতের মুঠোয় এসেছে ই-কমার্স এর মাধ্যমে। এ ব্যবস্থায় বিশ্বের এক প্রান্তে বসে আরেক প্রান্তে ব্যবসায়ের কার্যাদি সম্পন্ন হচ্ছে।
বৃহদায়তন কর্মকান্ডের প্রসারঃ বৃহদায়তন বাজার ব্যবস্থার যে বিস্তার লক্ষ্য করা যায় তাতে বৃহৎ উৎপাদন ও বিপণন সহজসাধ্য হয়েছে। আর এটি মূলত বিশ্বায়নের সুফল। এতে একদিকে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাচ্ছে অন্যদিকে মুনাফার পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জ্ঞান ও দক্ষতার সমন্বয়: বিশ্বায়নের ফলে যেমন বিশ্ব খুব কাছাকাছি এসে কাজ করছে ঠিক তেমনি উন্নত দেশসমূহের জ্ঞান, দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা অন্যান্য দেশ সহজে কাজে লাগিয়ে নিজেদের সমৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। যার দরুণ বিশ্বে জ্ঞান ও দক্ষতার সমন্বয় সাধিত হচ্ছে।
যোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তির উন্নতিঃ বিশ্বায়নের ফলে বিশ্বে যোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। এ কথা সহজে বলা যায় যে, অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে যোগাযোগ অধিক সহজতর। আবার তথ্যপ্রযুক্তিতে যে যতো উন্নত সে ততো উন্নয়ন করতে সক্ষম হচ্ছে।

বিশ্বায়নের কুফলঃ বিশ্বায়নের সুফলের পাশাপাশি এর কিছু কুফলও লক্ষ্য করা যায়। সেগুলো হলো-
অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধিঃ এক দেশের সাথে আরেক দেশের যে অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি হয়েছে তা মূলত বিশ্বায়নেরই ফল হিসেবে বিবেচিত হয়।
অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টিঃ বিশ্বায়নের ফলে যে দেশগুলো শিল্পে অনুন্নত সে দেশগুলো প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে শিল্প কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছে। ফলে বেকারত্বের হার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
শিক্ষা ব্যবস্থার বিপর্যয়ঃ উন্নত বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থা অধিক উন্নত বিধায় অনুন্নত দেশ উপকৃত হওয়ার আশায় একদিকে যেমন প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে, অন্যদিকে তাদের নিজস্ব শিক্ষা ব্যবস্থাও ধ্বংস হচ্ছে।
গোপনীয়তা রক্ষা কঠিনঃ ইন্টারনেট, ই-মেইল, ফ্যাক্স ইত্যাদি ব্যবহারের মাধ্যমে অনুন্নত দেশগুলোর গোপনীয় দলিল, সংবাদ ও তথ্য অতি তাড়াতাড়ি বিদেশি প্রতিপক্ষের হস্তগত হচ্ছে।
সাংস্কৃতিক সংকটঃ বিশ্বায়নের দ্বারা সংস্কৃতি আজ চরমভাবে বিপর্যস্ত। ধনী দেশসমূহের অপসংস্কৃতির প্রভাবে গরীব বা অনুন্নত দেশের সংস্কৃতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
আমাদের করণীয়ঃ আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বিশ্বায়নের এই তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে কতগুলো পদক্ষেপ নিতে হবে। যথা-
- তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নে উৎসাহমূলক কর্মকান্ড ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
- জনশক্তির কর্মদক্ষতা বাড়ানোর জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখতে হবে।
- প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে শিক্ষিত বেকারদের কাজে লাগাতে হবে।
- সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি প্রতিরোধে আইনের শাসনের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
- দারিদ্র্য নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
উপসংহারঃ বিশ্বকে একই আয়নায় দেখার জন্য বিশ্বায়নের সৃষ্টি। বিশ্বায়নের কিছু নেতিবাচক প্রভাব বা কুফল থাকলেও এটি তার আপন গতিতে চলমান। তাই এর নেতিবাচক দিকগুলোর প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রেখে ইতিবাচক দিকগুলোর সুফল অর্জন করাই আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর করণীয় হওয়া উচিত।

মানবাধিকার

(সংকেত: ভূমিকা; মানবাধিকারের ধারণা; মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাস; মানবাধিকার এবং বর্তমান বিশ্ব; মানবাধিকার ও উন্নয়ন; মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সুফল; প্রতিবন্ধকতা; মানবাধিকার ও বাংলাদেশ; মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার ও সংস্থাসমূহের ভূমিকা; বাংলাদেশে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম; উপসংহার।)
বর্তমান বিশ্বে মানবাধিকার ধারণাটি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে, তবে এই ধারণাটি সাম্প্রতিক বা নতুন নয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লালিত বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে মানবাধিকারের বিষয়টি খুঁজে পাওয়া যায়। হযরত মুহম্মদ (স.), যিশু খ্রীস্ট, গৌতম বুদ্ধ প্রমুখ মহামানবগণ ছিলেন মানবাধিকার ধারণার প্রবক্তা। বর্তমানকালেও মার্টিন লুথার কিং, মহাত্ম গান্ধী, মাদার তেরেসা, নেলসন ম্যান্ডেলা প্রমুখ ব্যক্তিগণের মধ্যে মানবাধিকারের বিষয়টি স্বরূপে ভাস্বর।
মানবাধিকারের ধারণাঃ ১৯১৪ সালের ১ম বিশ্বযুদ্ধের পর মানবাধিকারের বিষয়টি মানুষকে ব্যাপকভাবে ভাবিয়ে তোলে। যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট নানা নৈরাজ্য, দুর্ভিক্ষ, হতাশা, অনাহার, নৈতিকতার অবক্ষয় প্রভৃতি অবস্থা উত্তরণের জন্য সমগ্র বিশ্বে একটি নীতির প্রয়োজন দেখা দেয়, যে নীতি দ্বারা বিশ্বের মানুষকে ক্ষুধা, দারিদ্র্যের হাত থেকে রক্ষা করা যাবে। এছাড়া পরবর্তীতে হিটলারের গঠিত ন্যাৎসী বাহিনীর অমানবিক অত্যাচার ও অনাচার থেকে মানুষকে রক্ষা করার কথা ভেবেছিলেন তৎকালীন বিশ্বের কিছু মানুষ। এসবের পরিপ্রেক্ষিতেই প্রতিষ্ঠিত হয় মানবাধিকার। মূলত মানবাধিকার মানে বোঝায়- ক্ষুধা থেকে মুক্তি, ভোটের অধিকার, মত প্রকাশের অধিকার, শিক্ষার সুযোগ লাভ, ব্যক্তিচিন্তার স্বাধীনতা, চিকিৎসার নিশ্চয়তা, সকল অধিকার ভোগের নিশ্চয়তা, সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষের সমান উন্নতির নিশ্চয়তা প্রভৃতি।
মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসঃ মানবাধিকারের সার্বজনীন রূপটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১৪ সালের ভয়াবহ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর। প্রতিষ্ঠিত হয় 'League of nations'. এটির উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন স্বায়ত্ত্বশাসিত কিংবা Trust Territory গুলোর মাধ্যমে জনগণের কল্যাণ সাধন করা। 'League of nations'-এর অঙ্গ সংগঠন ILO এর শ্রমিকের কর্মসময় ও পারিশ্রমিক নির্ধারণ করার মাধ্যমে মানবাধিকারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। এরপর ১৯৪৪ সালে ওয়াশিংটনের Dumberton Oaks ভবনে জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলোচনায় Human Rights প্রসঙ্গটি স্থান পায়। ২৬ জুন, ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ সনদ স্বাক্ষরিত হয়। সনদ অনুযায়ী মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহ বা Fundamental human Rights হলো Dignity and worth of human Beings বা মানুষের মর্যাদা ও মূল্য, সমঅধিকার, ন্যায়বিচার, সামাজিক অগ্রগতি, মৌলিক স্বাধীনতা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি। পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র বা Universal Declaration of Human Rights গৃহীত হয়। এইদিন ফ্রান্সে UDHR (Universal Declaration of Human Rights) ঘোষণা করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের পত্নী মিসেস ইলিনর রুজভেল্ট। এভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয় মানবাধিকার।
মানবাধিকার এবং বর্তমান বিশ্ব: Universal Declaration of Human Rights যখন গৃহীত হয় তখন UNO’র সদস্য ছিল ৫৮। বর্তমানে ১৯৩টি দেশ UNOÕi সদস্য হয়েছে। আর এই সকল দেশই UNOÕi নীতিমালা মেনে চলার জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ। মানবাধিকার ঘোষণায় সকল ধর্ম বর্ণের এবং সকল জাতির সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ঘোষণার মধ্য দিয়ে মানুষের মৌলিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিশ্চিত করারও অঙ্গীকার করা হয়।
UDHRÑ এর পথ ধরেই গৃহীত হয়েছে-
i) International convention on Civil and Political Rights.
ii) International convention of Economic, Social and Cultural Rights.
iii) Convention on the Rights of the Child.
iv) International convention on the Elimination of All Forms of Discrimination Against Women.  ইত্যাদি।
UNICEF, UNHCR, ILO, UNESCO, CEADAW ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানসমূহ মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছে। এছাড়াও যুক্তরাজ্যের অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, যুক্তরাষ্ট্রের হিউমান রাইট ওয়াচ বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে।
মানবাধিকার ও উন্নয়নঃ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১৯৮৬ সালে গৃহীত এক প্রস্তাবে উন্নয়নকে মানবাধিকারের আওতাভূক্ত করে নেয়। প্রকৃতপক্ষে উন্নয়ন ও মানবাধিকার এ দুটি ধারণা পরস্পরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মূলত উন্নয়নকে জাতিসংঘ মানবাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেছে। তবে উন্নয়ন সাধিত হচ্ছে কিনা তার জন্য প্রয়োজন হবে-
i) মৌলিক জীবনধারণের অধিকার (Condition of life) যেমন-খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান, অবসর ও বিনোদন প্রভৃতি সুযোগ ভোগ করার নিশ্চয়তা রয়েছে কিনা।
ii) Condition of Work অর্থাৎ চাকরি, আয় ইত্যাদির অধিকার আছে কিনা।
iii) Equality of Access of resources অর্থাৎ ভূমি, পুঁজি প্রভৃতি প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার ভোগ করছে কিনা।
iv) Participation বা স্থানীয়, জাতীয় অথবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত  কিনা।
এসবের হিসেবে UNDP, Human Development Index প্রকাশ করেছে এবং আয়ুষ্কাল, বয়স, শিক্ষা, আয় প্রভৃতি বিষয়গুলোকে উন্নয়নের পরিমাপক হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
মানবাধিকারের সুফলঃ সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার পর অসংখ্য উদ্যোগ এবং কর্মকৌশল গ্রহণ করা হয়েছে যা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার পর বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটেছে। জনসাধারণের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে ঘৃণ্য ও বর্বরোচিত দাসপ্রথার বিলুপ্তি ঘটেছে। নারী-পুরুষের সমান অধিকার অনেকাংশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষার গুরুত্বকে বিবেচনা করে ১৯৯৫ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত মানবাধিকার শিক্ষা দশক হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল।
প্রতিবন্ধকতাঃ মানবাধিকার সমগ্র বিশ্বে অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করেছে। তবুও এর কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। মূলত বিশ্বে এখনো মানবাধিকার পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিশ্বের এক বিরাট জনগোষ্ঠী মানবাধিকার সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এখন পর্যন্ত তৃতীয় বিশ্বের জনগণের ক্ষুধা নিবারণের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাস্তবভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারেনি। এখনো বিশ্বের দুই তৃতীয়াংশ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায়নি অনেক দেশে। মুক্ত বাজার অর্থনীতি পুরোপুরি সুফল বয়ে আনতে পারেনি।
মানবাধিকার ও বাংলাদেশঃ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ জন্মলগ্নের পরপরই গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জনঅধিকারকে সংবিধানে স্থান দিয়েছে। খুব তাড়াতাড়িই অর্থাৎ ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত হয়েছে। ১০ই ডিসেম্বর যথাযথ মর্যাদার সাথে এখানে পালিত হয় মানবাধিকার দিবস। তবে মানবাধিকার পুরোপুরি রক্ষিত হয়নি-এ দেশে। বাংলাদেশ মানবাধিকার সমন্বয় পরিষদের ভাষ্যমতে ১৯৯৬ সালের নয় মাসে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ মানবাধিকার লংঘনের শিকার হয়েছে। পুলিশ ও জেলহাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু, সড়ক ও নৌদুর্ঘটনা, যৌতুকপ্রথা, খুন-রাহাজানি, ধর্ষণ, আত্মহত্যা, সন্ত্রাস এখন বাংলাদেশের অতি স্বাভাবিক ঘটনা। এসবই মানবাধিকার লংঘনের কারণ। সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি আমাদের সাধারণ মানুষগুলোর জীবনকে বিপন্ন করে দিয়েছে। আবার নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক দলীয় কোন্দল, হত্যা, গুম। এমতাবস্থায় এদেশে মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, বিশৃঙ্খলামুক্ত সমাজ গঠন না করা গেলে, মানবাধিকার এখানে শুধু কথাতেই থেকে যাবে, কার্যে তা প্রকাশ পাবে না।
মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার ও সংস্থাসমূহের ভূমিকাঃ আশার কথা হলো বাংলাদেশ সরকার মানবাধিকার রক্ষায় কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা অন্যতম। সংবিধানে ২৬-৪৭ অনুচ্ছেদে মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণের স্বীকৃতি রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন NGO মানকবাধিকার রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। ৮০’র দশক থেকেই বেসরকারিভাবে তারা কার্যক্রম শুরু করেছে এদেশে।
বাংলাদেশে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগ্রামঃ এদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় প্রতিটি ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়েছে দুর্নীতির থাবা। সামরিকতন্ত্র, ভোটারবিহীন ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ, কালো টাকার দৌরাত্ম, রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রভৃতির মধ্যেও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সরকারি পর্যায়ে প্রাণান্ত চেষ্টা চলছে। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও সুজন, আইন ও সালিস কেন্দ্র প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করে যাচ্ছে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায়। সরকারিভাবে মানবাধিকার রক্ষায় ১ সেপ্টেম্বর ২০০৮ সালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন করেছে বাংলাদেশ সরকার।
উপসংহারঃ গণতান্ত্রিক ও মানবিক মূল্যবোধকে ধারণ করে পরস্পরের প্রতি সহযোগিতা, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্ব নিয়েই দেশ ও বিশ্বে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। সমগ্র বিশ্বের নির্যাতিত মানুষগুলোর চোখের পানি মুছে দিয়ে তাদের অধিকারকে যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠার জন্য মানবাধিকার সংরক্ষণ একান্তভাবে জরুরি। তাহলেই সমগ্র বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হবে শান্তি, সম্প্রীতি, এগিয়ে যাবে দেশ, এগিয়ে যাবে পৃথিবী আর মানব সভ্যতা।

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী

(সংকেত: আদিবাসী এবং ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী; বাংলাদেশের ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর পরিসংখ্যান; চাকমা; মারমা; তঞ্চঙ্গ্যা; গারো; রাখাইন; মনিপুরী; হাজং; সাঁওতাল; খাসিয়া; অন্যান্য; বর্তমানে ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীদের অবস্থা; উপসংহার।)
বাংলাদেশ একটি বহু জাতি, সংস্কৃতি, ধর্ম এবং ভাষার দেশ। এদেশের বাংলা ভাষাভাষি বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বাঙালিদের পাশাপাশি সুদীর্ঘকাল ধরে বসবাস করছে বেশ কিছু ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়। আচারে, অনুষ্ঠানে, ধর্মে, ভাষায়, সংস্কার-সংস্কৃতিতে এরা বাঙালিদের থেকে স্বতন্ত্র। এরা বাংলাদেশেরই অবিচ্ছেদ্য এবং অনিবার্য অংশ।
আদিবাসী এবং ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীঃ আদিবাসী এর ইংরেজি প্রতিশব্দ Aborigines, শব্দটি ল্যাটিন শব্দ Aborigine থেকে এসেছে যার অর্থ “শুরু থেকে” অর্থাৎ কোনো দেশে বসবাসরত আদিম জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী বলা হয়। অন্যদিকে, ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী বলতে মূলত প্রধান জাতির পাশাপাশি বসবাসরত সংখ্যালগিষ্ঠ এবং অপেক্ষোকৃত অনগ্রসর জাতি বা সম্প্রদায়কে বোঝানো হয়।
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর পরিসংখ্যানঃ বাংলাদেশের ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে মতভেদ আছে। ১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশে ২৯টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। যাদের বেশিরভাগই পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় বাস করে। ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী দেখা গেছে বাংলাদেশে মোট আদিবাসীদের সংখ্যা ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৭৭৫ জন। তবে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের দেওয়া তথ্যানুযায়ী ৪৫টি ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে এবং সর্বমোট ২০ লক্ষাধিক আদিবাসী আছে বলে জানা যায়। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- চাকমা, মারমা, রাখাইন, তঞ্চঙ্গ্যা, মনিপুরি, গারো, হাজং, সাঁওতাল, খাসিয়া প্রভৃতি নৃ-গোষ্ঠীগুলো। এরা বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সিলেট, রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, রাজশাহী, ঠাকুরগাঁও, কক্সবাজার প্রভৃতি অঞ্চলগুলোতে যুগ যুগ ধরে বাস করছে।
চাকমাঃ বাংলাদেশের ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সর্ববৃহৎ সম্প্রদায় হলো ‘চাকমা’। চাকমারা নিজেদেরকে বলে চাঙমা। বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষত রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবন প্রভৃতি জেলায় এদের বাস। এরা আবার ছোট ছোট গোষ্ঠীতে বিভক্ত। এদের নিজস্ব সামাজিক, প্রশাসনিক ও বিচার ব্যবস্থা আছে যার প্রধান দায়িত্বে আছে রাজা। রাজাই চাকমাদের প্রথা, রীতি-নীতি নির্ধারণ, ভুমি, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, গ্রামের কোন্দল এবং নানা সমস্যার নিষ্পত্তি করে। চাকমাদের সমাজব্যবস্থা পিতৃতান্ত্রিক। ফলে পুত্রসন্তানরাই কেবল পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভ করে। কৃষি এদের প্রধান জীবিকা হলেও বর্তমানে চাকমারা চাকুরী ও ব্যবসাক্ষেত্রেও জায়গা করে নিয়েছে। আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে চাকমাদের স্বাক্ষরতার হার (৩৭.৭%) সবচেয়ে বেশি। এরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। এদের প্রধান প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবগুলোর মধ্যে আছে মাঘী পূর্ণিমা, বৈশাখী পূর্ণিমা, বৌদ্ধ পূর্ণিমা, কঠিন চীবর দান, মধু পূর্ণিমা, ফানুস ওড়ানো প্রভৃতি। চাকমাদের অন্যতম বড় উৎসব হলো বিজু উৎসব।
মারমাঃ সংখ্যাগরিষ্ঠের দিক থেকে দ্বিতীয় বৃহৎ সম্প্রদায় হলো ‘মারমা’। পার্বত্য জেলাগুলোতে মারমাদের বসবাস দেখা গেলেও এরা মূলত বান্দরবনের অধিবাসী। মায়ানমার থেকে এসেছে বলে এদেরকে মারমা বলা হয়। তবে মারমা শব্দটি এসেছে ‘ম্রাইমা’ শব্দ থেকে। বান্দরবনে প্রায় ১ লাখ মারমা বাস করে। চাকমাদের মতো এদেরও সামজিক বিচার-আচারের দায়িত্ব রাজার হাতে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা হলেও মারমা মেয়েরা পৈতৃক সম্পত্তির সমান উত্তরাধিকার লাভ করে। জুম চাষ, নদীর মাছ ও কাঁকড়া শিকার এবং কাপড়, চুরুট প্রভৃতি তৈরি করে এরা জীবিকা নির্বাহ করে। তবে শিক্ষা ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রসর হয়ে এরা চাকুরী, ব্যবসাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছে। মারমারা নিজস্ব ভাষায় কথা বললেও লেখার ক্ষেত্রে বর্মিজ বর্ণমালা ব্যবহার করে। মারমারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। এদের প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের মধ্যে আছে বৌদ্ধ পূর্ণিমা, কঠিন চীবর দান, ওয়াগ্যোয়াই প্রভৃতি।
তঞ্চঙ্গ্যাঃ বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর মধ্যে তঞ্চঙ্গ্যা উল্লেখযোগ্য। রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলায় এদের বাস। তঞ্চঙ্গ্যারা নিজেদের স্বতন্ত্র্য জাতি বলে দাবি করলেও নৃতাত্ত্বিকগণ মনে করেন এরা চাকমা জাতির একটি উপগোত্র। সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রথা, রীতি-নীতির দিক থেকে চাকমাদের সাথে এদের যথেষ্ট সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। তঞ্চঙ্গ্যাদের ভাষা ইন্দো-এরিয়ান ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। তঞ্চঙ্গ্যারা একে ‘মনভাষা’ বলে উল্লেখ করে।
গারোঃ বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার মধুপুরের গভীর অরণ্য, অরণ্য সংলগ্ন এলাকা এবং গারো পাহাড়ের টিলায় বাংলাদেশের অন্যতম ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী গারোদের বাস। এছাড়া নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলে কিছু কিছু গারোদের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। নৃতান্ত্রিকগণ মনে করেন এরা মঙ্গোলীয় জাতিগোষ্ঠীর একটি শাখা। গারোরা নিজেদের আচ্ছিক মান্দি অর্থাৎ পাহাড়ের মানুষ বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করে। তবে যারা সমতলে বাস করে তারা কেবল মান্দি বলে পরিচয় দেয়। গারোদের সমাজ ব্যবস্থা মাতৃতান্ত্রিক। গারোদের ভাষার নাম আচ্ছিক ভাষা। তবে সমতলে বসবাসকারী গারোদের ভাষা আলাদা, তাদের ভাষার নাম মান্দি ভাষা। গারোরা স্বতন্ত্র ধর্মমতে বিশ্বাসী আর তাদের সাংস্কৃতিক উৎসব, আচার-অনুষ্ঠানের মূলে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস। গারোদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব হলো নবান্ন বা ওয়ানগালা উৎসব।
রাখাইনঃ রাখাইন সম্প্রদায় মূলত মায়ানমারের একটি জাতিগোষ্ঠী। পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু অংশ, রাঙ্গামাটি ও বান্দবান জেলায় রাখাইনদের বাস। রাখাইনরা সাধারণত মগ নামে পরিচিত। রাখাইনরা বৌদ্ধ ধর্মালম্বী। ফলে এদের প্রধান উৎসবগুলো হলো- বুদ্ধের জন্মবার্ষিকী পালন, বৈশাখী পূর্ণিমা, মাঘী পূর্ণিমা প্রভৃতি। এছাড়া রাখাইনরা সংক্রান্তিতে ৩ দিনব্যাপী সাংগ্রাই উৎসব পালন করে অত্যন্ত জাকজমকপূর্ণভাবে। পুরুষেরা লুঙ্গি, ফতুয়া আর নারীরা লুঙ্গি, ব্লাউজ, অলংকার এবং মাথায় ফুল পরিধান করতে পছন্দ করে। রাখাইনদের বিয়েতে পুরুষদের পণ দেওয়ার প্রথা প্রচলিত আছে।
মনিপুরীঃ মনিপুরীদের আদি নিবাস ভারতের মনিপুর রাজ্যে। বার্মা-মনিপুর যুদ্ধের সময় এরা এসে বৃহত্তর সিলেটে আশ্রয় নিয়েছিল। এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং ময়মনসিংহেও মনিপুরীদের দেখতে পাওয়া যায়। ভাষাগত ও ধর্মীয় ভিন্নতার ফলে মনিপুরী সম্প্রদায় আলাদা আলাদা তিনটি উপ-গোষ্ঠীতে বিভক্ত। (১) বিষ্ণুপ্রিয়া, (২) মৈতৈ, (৩) পাঙন। ২০০৩ সালের এসআইএল ইন্টারন্যাশনাল পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট ৪০ হাজার বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরী এবং ১৫ হাজার মৈতৈ মনিপুরী আছে। মনিপুরীদের সংস্কৃতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও ঐতিহ্যাবাহী। বিশেষ করে মনিপুরী নৃত্য আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত। মনিপুরীদের সর্ববৃহৎ অনুষ্ঠান হচ্ছে রাসপূর্ণিমা।
হাজংঃ বাংলাদেশের ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হাজং সম্প্রদায়ের দেখা মেলে নেত্রকোনা জেলায়। হা মানে মাটি আর জং অর্থাৎ পোকা। প্রকৃতপক্ষে কৃষিকাজের সাথে সখ্যতার কারণে তাদের নাম দেওয়া হয়েছে হাজং। বাংলাদেশে প্রায় ৩০০০ হাজং এর বাস। হাজং বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলন প্রভৃতি আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার মাধ্যমে এরা ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে। হাজংদের নিজস্ব ভাষা আছে। হাজংদের সবচেয়ে বড় উৎসব ‘প্যাক খেলা’ উৎসব। এদের কিছু অংশ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং কিছু অংশ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। ভাত, মাছ, সবজি ছাড়াও কচি বাঁশের গুড়া বা মিউয়া এদের প্রিয় খাবার।
সাঁওতালঃ পূর্বভারত ও বাংলাদেশের বৃহত্তম আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো সাঁওতাল। বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে বিশেষত দিনাজপুর এবং রংপুরে সাঁওতালদের বাস। সাঁওতাল সম্প্রদায় আবার ১২টি উপগোত্রে বিভক্ত। এরা মাটির তৈরি ছোট ছোট ঘরে বাস করে। সাঁওতালদের প্রধান পেশা কৃষি। সাঁওতালদের প্রধান দেবতা বোংগা। এরা মূলত সূর্যের পূজা করে। সাঁওতালদের বার্ষিক উৎসবের নাম সোহরাই। এ উৎসবে সাঁওতাল মেয়েরা দলবেঁধে নাচে। সাঁওতালদের প্রধান খাদ্য ভাত। এছাড়া মাছ, কাঁকড়া, শুকর, মুরগি, খরগোস, গুইসাপ, ইঁদুর এবং বেজির মাংস খেতে পছন্দ করে সাঁওতালরা। সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণে ইতিহাসে এরা বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
খাসিয়াঃ বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে খাসিয়াদের বাস। মূলত ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন গভীর অরণ্যে থাকতেই পছন্দ করে এরা। বাংলাদেশে বসবাসকারী খাসিয়ারা সিনতেং গোত্রভুক্ত। খাসিয়ারা মূলত কৃষিজীবী। গভীর অরণ্যে এরা পান চাষ করে। মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার কারণে নারীরা বিয়ে করে বর নিয়ে আসে নিজের বাড়িতে। সম্পত্তির মালিকানাও নারীরাই লাভ করে।
অন্যান্যঃ আলোচিত সম্প্রদায়গুলো ছাড়াও বাংলাদেশে ত্রিপুরা, খিয়াং, মুন্ডা, চক, লুসাই প্রভৃতি আরো কিছু কিছু ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী বসবাস করে থাকে।
বর্তমানে ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীদের অবস্থাঃ অতীতে যদিও এই ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠের হাতে নানাভাবে নির্যাতিত, নিগৃহীত হতো কিন্তু বর্তমানে সে অবস্থার পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে সরকার ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীদের জন্য বিশেষ কোটা, বৃত্তিমূলক শিক্ষা সহায়তাসহ নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করে পিছিয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে প্রাগসর করে তুলতে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। আদিবাসী সম্প্রদায়গুলো এখন কেবল কৃষিকাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করে না বরং তারা উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সম্মানজনক পদে চাকুরী করছে। এছাড়া ব্যবসা, রাজনীতি, শিল্প-সংস্কৃতি প্রভৃতি সকল ক্ষেত্রে তাদেরকে এগিয়ে নিয়ে আসার লক্ষ্যে তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে।
উপসংহারঃ বাংলাদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়গুলো এ দেশের নাগরিক। তাই তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তাদের সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। বর্তমানে কিছু কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলে আরো ব্যাপক পরিসরে তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, রীতি-নীতি, জীবনযাপন প্রভৃতি বিষয় নিয়ে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন এবং এগুলো সংরক্ষণ করার যথাযথ ও কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া উচিত।